বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

100

একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১১ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার।২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে সিলেটে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, কিংবা গাড়ি চলে না চলে না রে, কোন মেস্তুরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়, তোমরা কুঞ্জ সাজাও গোসহ অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা একুশে পদক প্রাপ্ত বাউল শাহ আবদুল করিম।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গুণী এই ব্যক্তি। আমৃত্যু তিনি ওই গ্রামেই ছিলেন।

প্রতিবার প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তার উজানধলের সমাধি ও বাড়ি ঘিরে জড়ো হন অসংখ্য ভক্ত। বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা এবং রাতভর চলে বাউল করিমের গানের আয়োজন।

তবে এবার করোনা পরিস্থিতিতে অনেকটা নীরবেই যাবে এই বাউলসম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যু দিবসটিকে ঘিরে করিমের জন্মস্থান দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামেও নেই তেমন কোনো আয়োজন।

শাহ আব্দুল করিমের পরিবার ও শাহ আব্দুল করিম স্মৃতি পরিষদ দিরাই এর উদ্যোগে করিমের গ্রামের বাড়িতে সীমিত পরিসরে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

এছাড়া জেলার ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ভক্তবৃন্দ এসে জড়ো হবেন তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে। সেখানে তারা নিজেদের মতো করে তাদের গুরু বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে স্মরণ করবেন।

সারা রাত ধরে গাইবেন করিমের গাওয়া ও লেখা সকল গান। এবার করোনাভাইরাসের কারণে কোনো স্থানে হচ্ছে না গানের আসর বা স্মরণসভা।

শাহ আবদুল করিম জীবনভর তার গানে অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির কথা বলে গেছেন। তার গানে যেমন প্রেম-বিরহ ছিল, তেমনি ছিল খেটে খাওয়া মানুষের কথা। একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ভাবনাও রয়েছে তার সৃষ্টিকর্মের বিশাল অংশজুড়ে।

অভাব-অনটন, দুঃখ-দারিদ্র্যে বেড়ে ওঠা বাউল করিমের বয়স যখন ১২, তখন রাখালের চাকরি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী ধলবাজারের এক মুদি দোকানে কাজ নেন। দিনে চাকরি আর রাতে হাওর-বাঁওড় ঘুরে গান গাইতেন। ওই সময় গ্রামের নৈশবিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনা হয়নি করিমের। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান গাইতেন তিনি। পুরো ভাটি এলাকায় নাম ছড়াতে থাকে তার। এরপর বিভিন্ন আন্দোলনে গণসঙ্গীত গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেন তিনি।

শাহ আবদুল করিমের জন্ম এক দিনমজুর পরিবারে। পিতা ইব্রাহীম আলী মা নাইওরজান বিবি। জন্মের পর থেকে অভাবের মধ্যেই তিনি বেড়ে উঠেন। অভাবের কারণে শিক্ষা লাভের সুযোগ আসেনি তাঁর জীবনে। তাই গ্রামের মোড়লের বাড়িতে গরু রাখালের চাকরী নিলেন তিনি। সাড়া দিন মাঠে গরু চরাতেন আর গান গাইতেন। এ গানই রাখাল বালককে বাউল সম্রাটে পরিণত করেছে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন শাহ আবদুল করিম। বাউলের বিখ্যাত একটি গান। ’এই দেশে স্বার্থ পরদের চলেছে রঙের খেলা/ কোন কাজে গেলেই বলে ঘুষ দিলা/ কি জ্বালা/

বাংলা একাডেমী থেকে তার ১০টি কালজয়ী গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এছাড়া তার ৬টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সংগীত সাধনায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২১শে পদকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ-থেকে আড়াই শতাধিক পদক ও সম্মাননা পেয়েছিলেন।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের পুত্র শাহ নূর জালাল বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের কারণে প্রয়াণ দিবসে কোন আনুষ্ঠানিকতা আয়োজন করা হয়নি। তবে অনলাইনে ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে করিম ভক্তবৃন্দরা তাঁর গান পরিবেশন করবেন। ’

শাহ আবদুল করিমের গানের বিভিন্ন বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় আফতাব সঙ্গীত, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় গণসংগীত, ১৯৮১ সালে কালনীর ঢেউ, ১৯৯০ সালে ধলমেলা, ১৯৯৮ সালে ভাটির চিঠি, ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র।